আজকের প্রশ্ন, আগামী দিনের প্রযুক্তি
কেন মৌলিক বিজ্ঞান এখনও মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন?
ড. এস. কে. দাস
বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর শিক্ষা: আগে বিজ্ঞান, পরে প্রযুক্তি
মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি অসাধারণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত সত্য আছে—বড় বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব কখনোই হঠাৎ করে ঘটে না।তার আগে ঘটে একটি দীর্ঘ, ধীর এবং গভীর বৈজ্ঞানিক যাত্রা। স্টিম ইঞ্জিনের কথা ধরুন। এটি শিল্পবিপ্লবের প্রতীক। কিন্তু এর পেছনেছিল তাপগতিবিদ্যার বিকাশ—যেখানে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছিলেন তাপ, শক্তি এবং কাজ আসলে কী।
আবার বিদ্যুতের যুগের দিকে তাকান। টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ফোন—সবই বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিদ্যুতের প্রকৃতিবোঝার কাজ শুরু হয়েছিল ফ্যারাডে, ম্যাক্সওয়েলদের মতো বিজ্ঞানীদের মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে, যাঁরা কৌতূহল থেকে প্রকৃতিকে বুঝতেচেয়েছিলেন, কোনো প্রযুক্তি বানানোর জন্য নয়।
একইভাবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জন্ম হয়েছিল এক গভীর সংকট থেকে—ক্লাসিক্যাল পদার্থবিদ্যা যখন পারমাণবিক জগতকে ব্যাখ্যাকরতে পারছিল না। তখন প্ল্যাঙ্ক, আইনস্টাইন, হাইজেনবার্গ, শ্রোডিঙ্গারের মতো বিজ্ঞানীরা নতুন এক বাস্তবতার দরজা খুলে দেন। সেইদরজার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় ট্রানজিস্টর, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, লেজার।
ডিএনএ–র গঠন আবিষ্কার শুধু জীববিজ্ঞানের একটি ঘটনা নয়। এটি পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, আধুনিকচিকিৎসা, এবং জীবপ্রযুক্তির বিপ্লব। আর তথ্যতত্ত্ব? ক্লদ শ্যাননের সেই তাত্ত্বিক কাজ আজ ইন্টারনেট, মোবাইল যোগাযোগ, ডিজিটালদুনিয়ার ভিত্তি।
এই ইতিহাস আমাদের একটাই কথা বলে—
প্রযুক্তি কখনোই প্রথম নয়।
প্রযুক্তি সবসময় দ্বিতীয় ধাপ।
আমরা কি অতীতের বিজ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে আছি?
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হতে পারে আমরা এক অসাধারণ প্রযুক্তির যুগে বাস করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, মহাকাশযান, জিন এডিটিং—সবকিছুই দ্রুত বদলে দিচ্ছে আমাদের জীবন। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে একটি সত্য স্পষ্ট হয়—এই সবপ্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছে বহু আগেই। আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে উঠেছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।
কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা তৈরি হয়েছে তারও আগে। তথ্যতত্ত্ব এসেছে ১৯৪৮ সালে।
ডিএনএ–র গঠন আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৫৩ সালে। অর্থাৎ আজকের প্রযুক্তিগত বিপ্লব মূলত অতীতের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের ফল। আমরাযেন এখন সেই পুরোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ফসল কাটছি।
এটা একদিকে আশ্চর্যজনক, কারণ বিজ্ঞান কত দূরদর্শী হতে পারে তা বোঝা যায়।
আবার অন্যদিকে এটি একটি সতর্কবার্তাও। কারণ প্রশ্ন হচ্ছে—নতুন ফসল কোথা থেকে আসবে?
বিজ্ঞানের সামনে এখনও অজানা বিশাল পৃথিবী
অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞান হয়তো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এখন শুধু প্রযুক্তি উন্নত করলেই চলবে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই উল্টো।
আমরা এখনও জানি না মহাবিশ্বের ৯৫% অংশ কী দিয়ে তৈরি।
আমরা জানি না ডার্ক ম্যাটার কী।
আমরা জানি না ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি কী।
আমরা জানি না মহাবিশ্বের শুরুতে কী ঘটেছিল।
আমরা জানি না জীবন কীভাবে প্রথম তৈরি হয়েছিল।
আমরা জানি না চেতনা কীভাবে কাজ করে।
আমরা জানি না তথ্য, এনট্রপি এবং বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক কী।
অর্থাৎ বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো এখনও খোলা রয়ে গেছে। আর এই প্রশ্নগুলোই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কোথা থেকে আসবে?
ইতিহাস আমাদের শেখায়—যখনই মানুষ প্রকৃতির নতুন কোনো স্তর বুঝতে পেরেছে, তখনই নতুন প্রযুক্তির জন্ম হয়েছে। বিদ্যুৎ বোঝারপর এসেছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোয়ান্টাম বোঝার পর এসেছে কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক্স। জীবনের আণবিক ভিত্তি বোঝারপর এসেছে জিন প্রযুক্তি।
তাহলে ভবিষ্যতে কী আসতে পারে?
সম্ভবত— তথ্য ও বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক থেকে নতুন ধরনের কম্পিউটিং, এনট্রপির গভীর বোঝাপড়া থেকে নতুন শক্তি প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম জড়াজড়ি থেকে নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা মহাকাশ–সময়ের প্রকৃতি বোঝা থেকে নতুন মহাকাশযাত্রা। এগুলো আজ কল্পনারমতো শোনালেও ইতিহাস বলে—আজকের কল্পনাই আগামী দিনের বাস্তবতা।
বিজ্ঞান শুধু প্রযুক্তির জন্য নয়—এটি মানবজিজ্ঞাসার যাত্রা
বিজ্ঞানকে শুধু প্রযুক্তির কারখানা হিসেবে দেখা ভুল হবে। বিজ্ঞান আসলে মানুষের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার যাত্রা— আমরা কোথা থেকে এলাম? মহাবিশ্ব কেন আছে? প্রকৃতি কীভাবে কাজ করে? জীবন কী? চেতনা কী?
এই প্রশ্নগুলো কোনো শিল্পকারখানা থেকে আসে না। এগুলো আসে মানুষের কৌতূহল থেকে, বিস্ময় থেকে, এবং বোঝার তৃষ্ণা থেকে।আর এই তৃষ্ণাই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শেষ কথা: প্রশ্নই ভবিষ্যতের দরজা
মানবসভ্যতার ইতিহাস আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর শিক্ষা দেয়— যে সভ্যতা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, সে ধীরে ধীরে নতুন জ্ঞানতৈরি করার ক্ষমতাও হারায়। আর যে সভ্যতা প্রশ্ন করতে জানে, সে সবসময় নতুন পথ খুঁজে পায়। তাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নির্ভর করবেশুধু আমাদের দক্ষতার উপর নয়, আমাদের কৌতূহলের উপরও। কারণ প্রতিটি বড় প্রযুক্তির জন্ম হয় একটি ছোট প্রশ্ন থেকে। আর সেইপ্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের নতুন পৃথিবী।

