Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

হোলোগ্রাফি, তথ্য এবং মহাবিশ্ব: আধুনিক মহাকাশতত্ত্বে এক বিপ্লবী ধারণা

হোলোগ্রাফি, তথ্য এবং মহাবিশ্ব: আধুনিক মহাকাশতত্ত্বে এক বিপ্লবী ধারণা

এস কে দাস 

. হোলোগ্রাফি কী?

“হোলোগ্রাফি” শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ হোলস (সমগ্র) এবং গ্রাফেইন (লেখা) থেকে। এর অর্থ হলো—কোনো বস্তুর সম্পূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করা। এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক ছিলেন Dennis Gabor। তিনি ১৯৪৭ সালে প্রথম হোলোগ্রাফির ধারণা দেন এবং পরে এর জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সাধারণ ফটোগ্রাফে কেবল আলোর উজ্জ্বলতা রেকর্ড করা হয়। কিন্তু হোলোগ্রাফিতে আলোর উজ্জ্বলতার পাশাপাশি তার তরঙ্গগত তথ্যও সংরক্ষিত হয়। ফলে একটি সমতল ফিল্ম বা কাচে এমন তথ্য রাখা সম্ভব হয়, যা পরে ত্রিমাত্রিক চিত্র হিসেবে পুনর্গঠিত হতে পারে।

এখানেই প্রথম দেখা যায় একটি বিস্ময়কর সত্য:

একটি দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠে এমন তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব, যা থেকে একটি ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা পুনর্নির্মাণ করা যায়। পরে এই ধারণাই মহাবিশ্ব সম্পর্কে এক নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।

. কালো গহ্বরের গবেষণা এবং হোলোগ্রাফিক নীতির জন্ম

হোলোগ্রাফিক নীতির প্রকৃত সূচনা ঘটে কালো গহ্বর (Black Hole) নিয়ে গবেষণা থেকে। ১৯৭০-এর দশকে ইসরায়েলি পদার্থবিজ্ঞানী Jacob Bekenstein একটি যুগান্তকারী ধারণা দেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে কালো গহ্বরেরও এনট্রপি বা তথ্যবিষয়ক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী Stephen Hawking দেখান যে কালো গহ্বর সম্পূর্ণ কালো নয়; কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে তারা বিকিরণ নির্গত করতে পারে। এই বিকিরণ আজ “হকিং বিকিরণ” নামে পরিচিত।

বেকেনস্টাইন ও হকিংয়ের গবেষণায় একটি বিস্ময়কর বিষয় প্রকাশ পায় তাহলো,  কালো গহ্বরের তথ্য ধারণক্ষমতা তার আয়তনের সঙ্গে নয়, বরং তার পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এটি প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।

এই ফলাফল বিজ্ঞানীদের ভাবতে বাধ্য করে যে, প্রকৃতির মৌলিক তথ্য কি আসলে পৃষ্ঠে সংরক্ষিত হয়?

. হোলোগ্রাফিক নীতির প্রস্তাবনা

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী Gerard ‘t Hooft এবং মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী Leonard Susskind ১৯৯০-এর দশকে “হোলোগ্রাফিক নীতি” (Holographic Principle) প্রস্তাব করেন।

তাদের বক্তব্য ছিল:

মহাবিশ্বের কোনো অঞ্চলের ভেতরে যা কিছু আছে, তার সমস্ত মৌলিক তথ্য সেই অঞ্চলের সীমানা-পৃষ্ঠে সংকেতাকারে সংরক্ষিত থাকতে পারে।অর্থাৎ, একটি ত্রিমাত্রিক জগতের সম্পূর্ণ বিবরণ হয়তো একটি দ্বিমাত্রিক সীমানায় লেখা থাকতে পারে। এটি আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গভীর ধারণা।

. ধারণাটি বোঝার একটি সহজ উদাহরণ

ধরুন একটি সিনেমার পর্দা।

পর্দাটি দ্বিমাত্রিক। কিন্তু সেখানে আমরা গভীরতা, দূরত্ব, চলাচল এবং ত্রিমাত্রিক জগতের অনুভূতি পাই। হোলোগ্রাফিক নীতি বলছে, মহাবিশ্বও হয়তো কোনো অর্থে এমন হতে পারে।

আমরা যে ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা দেখি, তার গভীরে হয়তো আরও মৌলিক তথ্যগত কাঠামো কাজ করছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবী বা মহাবিশ্ব অবাস্তব।বরং এর অর্থ হলো: বাস্তবতার গভীরতম স্তরে তথ্যের ভূমিকা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি মৌলিক হতে পারে।

. হোলোগ্রাফি আধুনিক মহাকর্ষ তত্ত্ব

১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনীয়-মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী Juan Maldacena এক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, যা AdS/CFT Correspondence নামে পরিচিত।

এটি দেখায় যে, একটি উচ্চমাত্রিক মহাবিশ্বে মহাকর্ষের তত্ত্ব এবং তার সীমানায় অবস্থিত নিম্নমাত্রিক কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব গাণিতিকভাবে একই বাস্তবতার দুটি ভিন্ন বর্ণনা হতে পারে। অনেক পদার্থবিজ্ঞানী মনে করেন, এটি হোলোগ্রাফিক নীতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

. মহাবিশ্ব কি মূলত তথ্য দিয়ে গঠিত?

এই প্রশ্নটি আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন গণিতবিদ ও প্রকৌশলী Claude Shannon তথ্যতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরে মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী John Archibald Wheeler বিখ্যাত ধারণা দেন:

“It from Bit” অর্থাৎ, পদার্থগত বাস্তবতা হয়তো শেষ পর্যন্ত তথ্য থেকেই উদ্ভূত। হুইলারের মতে মহাবিশ্বের গভীরে পদার্থ নয়, তথ্যই সবচেয়ে মৌলিক উপাদান হতে পারে।

. স্থান সময় কি মৌলিক?

ঐতিহ্যগতভাবে আমরা মনে করি স্থান (Space) ও সময় (Time) মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, স্থান-কাল নিজেই উদ্ভূত হতে পারে। এই ধারণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন Ted Jacobson, Erik Verlinde এবং Mark Van Raamsdonk। তাদের কাজ থেকে ধারণা জন্মেছে যে,  কোয়ান্টাম তথ্য এবং কোয়ান্টাম জড়াজড়ি (Entanglement) থেকেই স্থান-কালের জ্যামিতি উদ্ভূত হতে পারে।

. মহাজাগতিক উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন চিন্তা

মহাবিশ্বের আদিম অবস্থা সম্পর্কে হোলোগ্রাফিক ধারণাকে মহাকাশতত্ত্বে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন বহু বিজ্ঞানী। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য Paul Steinhardt, Neil Turok, Raphael Bousso, Thomas Hertog। তাদের গবেষণা থেকে ধারণা এসেছে যে মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায় হয়তো একটি তথ্যগত অবস্থা দ্বারা বর্ণনা করা সম্ভব। যদিও এসব ধারণা এখনও গবেষণাধীন, তবু এগুলো মহাজাগতিক উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

. কোয়ান্টাম মহাকর্ষের সন্ধানে

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুটি মহান স্তম্ভ হল:

১. General Relativity — প্রতিষ্ঠাতা Albert Einstein

২. Quantum Mechanics — যার বিকাশে অবদান রেখেছেন Max Planck, Niels Bohr, Werner Heisenberg এবং Erwin Schrödinger।

সমস্যা হলো, এই দুটি তত্ত্বকে একত্র করা অত্যন্ত কঠিন।

হোলোগ্রাফিক নীতি বিজ্ঞানীদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে, যেখানে মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম তথ্য একই বাস্তবতার দুটি দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই কারণেই অনেক গবেষক মনে করেন যে ভবিষ্যতের “কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব”-এর কেন্দ্রে হোলোগ্রাফিক ধারণা থাকতে পারে।

১০. দার্শনিক তাৎপর্য

হোলোগ্রাফিক ধারণা শুধু পদার্থবিজ্ঞানের নয়, দর্শনের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ঐতিহ্যগত বস্তুবাদ বলত

পদার্থতথ্য সৃষ্টি করে

কিন্তু আধুনিক তথ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্ন তুলছে:

তথ্যজ্যামিতিপদার্থ

অর্থাৎ, তথ্য থেকে স্থান-কাল, আর স্থান-কাল থেকে পদার্থ ও শক্তির উদ্ভব হতে পারে।

এই ধারণা বিজ্ঞান, দর্শন এবং জ্ঞানতত্ত্বের এক নতুন সংলাপের সূচনা করেছে।

সংক্ষিপ্ত উপসংহার

হোলোগ্রাফিক নীতির বৌদ্ধিক যাত্রা শুরু হয়েছিল Dennis Gabor-এর হোলোগ্রাফি থেকে; কালো গহ্বর গবেষণায় Jacob Bekenstein ও Stephen Hawking তার গভীরতা উন্মোচন করেন; Gerard ‘t Hooft ও Leonard Susskind তাকে মৌলিক নীতিতে রূপ দেন; এবং Juan Maldacena তাকে একটি শক্তিশালী গাণিতিক ভিত্তি প্রদান করেন। আজ এই ধারণা আমাদের সামনে একটি অভূতপূর্ব সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে: মহাবিশ্বের গভীরতম ভাষা হয়তো পদার্থের ভাষা নয়, শক্তির ভাষাও নয়—বরং তথ্যের ভাষা। আর আমরা যে ত্রিমাত্রিক বিশ্বে বাস করছি, তা হয়তো সেই গভীর তথ্য-বাস্তবতার এক উদ্ভূত প্রকাশ।

Leave a comment

Bridging Science, Technology, and the Social Fabric

Newsletter Signup
Say Hello

Design by: Iftekhar Hossain  © Centre for Social Research-CSR 2026. All Rights Reserved.

From Physical Laws to Social Justice: Empowering the Analytical Mind.