কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণতন্ত্রীকরণ: চীনের বিকল্প পথ
লেখক: শিওং জিয়ে
তারিখ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বের দুই প্রযুক্তিগত পরাশক্তি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রকাশ করে “Winning the Race: America’s AI Action Plan”, যেখানে AI-কে একটি শূন্য-সম প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখানো হয়—যেখানে আমেরিকাকে “অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রশ্নাতীত বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত আধিপত্য” অর্জন করতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই চীন প্রকাশ করেতার “Global AI Governance Action Plan”, যেখানে AI-কে “মানবজাতির জন্য একটি আন্তর্জাতিক জনসম্পদ” হিসেবে তুলে ধরাহয় এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আহ্বান জানানো হয়। এক বিশ্লেষক আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গিকে “ডিজিটালমনরো নীতি” বলে উল্লেখ করেন, আর চীনের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলেন প্রযুক্তিগত বহুপাক্ষিকতার এক ঘোষণাপত্র।
ছয় মাস পর এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের ওপেন-সোর্স AI ইকোসিস্টেম বিশ্বব্যাপী ডাউনলোডের ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে।সরকারি নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়া ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকিয়ে প্রযুক্তিকে জনকল্যাণমুখী পথে পরিচালিত করে। “AI+” নামে একটি জাতীয়কৌশল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু সিলিকন ভ্যালির ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ না রেখে কারখানা, কৃষিখামার ও জ্বালানি ব্যবস্থায় নিয়েআসে। ফলে এখানে শুধু নীতিগত পার্থক্য নয়, একটি মৌলিক প্রশ্নের ভিন্ন উত্তরও স্পষ্ট হয়: AI কাকে সেবা দেবে?
চীনের অভিজ্ঞতা বলছে—AI সবার জন্য। এই গণতন্ত্রীকরণ তিনটি স্তরে ঘটে: (১) ওপেন-সোর্স প্রযুক্তির মাধ্যমে সকল দেশেরঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, (২) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকানো, এবং (৩) এমন প্রয়োগ নিশ্চিতকরা যা সমাজের সকল স্তরের উপকারে আসে।
ওপেন–সোর্সের মাধ্যমে প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ
দীর্ঘদিন ধরে সিলিকন ভ্যালির ধারণা ছিল—উন্নত AI তৈরির জন্য প্রয়োজন বিপুল পুঁজি, হাজার হাজার উন্নত চিপ, এবংপ্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রক্ষার জন্য গোপন প্রযুক্তি। কিন্তু DeepSeek এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হাংজৌ-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের R1 মডেল MIT লাইসেন্সের অধীনে প্রকাশ করে, যা অবাধ ব্যবহার, পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক প্রয়োগের সুযোগ দেয়। মাত্র প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২০০০ GPU ব্যবহার করে এই মডেল তৈরি করা হয়—যা আমেরিকান সমমানের প্রকল্পের তুলনায় প্রায় এক-শতাংশ খরচ। একই বছরের ডিসেম্বরে DeepSeek-V3.2 আন্তর্জাতিক গণিতঅলিম্পিয়াড ও তথ্যবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড—উভয় ক্ষেত্রেই স্বর্ণপদক অর্জন করে, যেখানে মানুষের অংশগ্রহণকারীদের মাত্র প্রায় ৮% এইসাফল্য অর্জন করতে পারে।
ওপেন AI মডেলের প্রধান প্ল্যাটফর্ম Hugging Face এই ঘটনাকে “DeepSeek Moment” বলে অভিহিত করে। এর ফলে ওপেন-সোর্সকার্যক্রমে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটে। Alibaba-র Qwen মডেল পরিবার ৭০০ মিলিয়ন ডাউনলোড অতিক্রম করে, Meta-র Llama-কেছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবহৃত ওপেন-সোর্স AI ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়। Baidu ২০২৪ সালে যেখানে কোনো মডেল প্রকাশ করেনি,২০২৫ সালে সেখানে ১০০টিরও বেশি মডেল প্রকাশ করে। বর্তমানে বৈশ্বিক ডাউনলোডের ক্ষেত্রে চীনা মডেলগুলো আমেরিকান মডেলকেছাড়িয়ে গেছে।
ওপেন-সোর্সের গুরুত্ব শুধু কোডের প্রাপ্যতায় নয়, জ্ঞানের প্রবাহে। DeepSeek তাদের পদ্ধতি Nature জার্নালে প্রকাশ করে, যা সমকক্ষমূল্যায়নের মাধ্যমে পুনরুত্পাদনযোগ্যতা নিশ্চিত করে। এর ফলে একটি বৈশ্বিক গবেষক ও উন্নয়নকারী সম্প্রদায় এই প্রযুক্তির উপরভিত্তি করে নতুন উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়। প্রতিযোগিতার ধরণও বদলে যায়—ক্ষমতার প্রশ্ন থেকে সরে এসে দক্ষ প্রয়োগের দিকে।
খরচের দিক থেকেও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। DeepSeek-এর API প্রতি মিলিয়ন ইনপুট টোকেনের জন্য মাত্র $০.২৮—যা আমেরিকানসেবার তুলনায় প্রায় ১৬ গুণ সস্তা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ ও উন্নয়নশীল দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য AI এখন অনেকবেশি সহজলভ্য।
ভারত ইতিমধ্যে DeepSeek প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে নিজস্ব মডেল তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যেখানে কৃষি ও জলবায়ুঅভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব্রাজিলও ৪ বিলিয়ন ডলারের AI পরিকল্পনায় দেশীয় মডেল তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন যে দরজা বন্ধ ছিল, তা এখন প্রকৌশলগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উন্মুক্ত হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শাসনের গণতন্ত্রীকরণ
প্রযুক্তি একা গণতান্ত্রিক ফল নিশ্চিত করতে পারে না। যথাযথ শাসন না থাকলে এর সুফল কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। চীনেরনিয়ন্ত্রক কাঠামো—যা পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়ই সীমাবদ্ধতামূলক হিসেবে চিত্রিত হয়—বাস্তবে একচেটিয়া ক্ষমতা প্রতিরোধে কার্যকরভূমিকা রাখে।
উদাহরণ হিসেবে, Ant Group-এর IPO ২০২০ সালে স্থগিত করা হয় আর্থিক ঝুঁকি ও তথ্যের কেন্দ্রীকরণ নিয়ে উদ্বেগের কারণে। Didi ২০২১ সালে তদন্তের মুখোমুখি হয় তথ্যের আন্তর্জাতিক প্রবাহ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়। এই পদক্ষেপগুলো বেসরকারি তথ্য একচেটিয়ার উত্থানরোধ করে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া AI-উৎপাদিত কনটেন্ট লেবেলিং নীতি—যেখানে AI দ্বারা তৈরি লেখা, ছবি ও ভিডিওস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হয়—স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, প্রযুক্তি নিষিদ্ধ না করেই। AI ডিভাইসে “কিল সুইচ” সংযোজন মানব নিয়ন্ত্রণবজায় রাখার একটি বাস্তবসম্মত উপায়। সামগ্রিকভাবে নীতি হলো—“প্রথমে পরীক্ষা, পরে আইন প্রণয়ন”।
চীনের বৈশ্বিক AI পরিকল্পনা এই নীতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রসারিত করে। এতে সীমান্ত-পার ওপেন-সোর্স সম্প্রদায় গঠন, প্রযুক্তিগতবাধা কমানো, এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এটি আমেরিকার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির বিপরীত,যেখানে প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়।
“AI+” কৌশল: প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রীকরণ
সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি দেখা যায় AI-এর ব্যবহার ক্ষেত্রে।
আমেরিকায় AI প্রধানত ভার্চুয়াল ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ—যেমন কোডিং সহায়তা, টেক্সট ও ভিডিও তৈরি। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমিত।কৃষি, উৎপাদন বা জ্বালানি খাত এখনো তুলনামূলকভাবে অপ্রভাবিত।
অন্যদিকে, চীনের “AI+” কৌশল AI-কে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। CATL ব্যাটারি উৎপাদনে ২৪ ঘণ্টার ভিজ্যুয়ালপরিদর্শনে AI ব্যবহার করছে। Mengniu গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণে AI ব্যবহার করছে। DingTalk প্ল্যাটফর্ম ৩০লাখের বেশি প্রতিষ্ঠানে AI-ভিত্তিক কাজের স্বয়ংক্রিয়তা প্রদান করছে।
২০২৫ সালে চীনের AI শিল্পের মূল্য এক ট্রিলিয়ন ইউয়ান অতিক্রম করে। দেশজুড়ে ৬০০-এর বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং কেন্দ্ররয়েছে, এবং প্রায় ২০০ মিলিয়ন শিল্প রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে—যা বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক।
এখানে AI-কে একটি পণ্য নয়, অবকাঠামো হিসেবে দেখা হয়—যেমন বিদ্যুৎ একসময় প্রতিটি শিল্পকে বদলে দিয়েছিল। ফলে এর সুফলপ্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষক, শ্রমিক ও সেবা খাতের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
লাতিন আমেরিকার জন্য তাৎপর্্যপূর্ণ
লাতিন আমেরিকা বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ILIA 2025 সূচক অনুযায়ী, বৈশ্বিক AI বিনিয়োগের মাত্র ১.১২% এই অঞ্চলে আসে,যদিও বৈশ্বিক GDP-তে এর অংশ ৬.৬%। তবে জেনারেটিভ AI ব্যবহারে এই অঞ্চল বিশ্বে তৃতীয়।
কিউবার “Cecilia” প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সীমিত সম্পদ ও দুর্বল অবকাঠামোর মধ্যেওএকটি ভাষা মডেল তৈরি করেছেন, যা কিউবার ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ওপেন-সোর্স ভিত্তির উপর নির্মিত এবংCreative Commons লাইসেন্সে প্রকাশিত।
তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অবকাঠামো, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নীতিনির্ধারণে ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। হার্ডওয়্যার ও ক্লাউড এখনো বড়শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
অতএব, মূল প্রশ্ন হলো—কোন পরাশক্তিকে অনুসরণ করা নয়, বরং নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা। আঞ্চলিক সহযোগিতা—যেমন যৌথগবেষণা ও মান নির্ধারণ—এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার
চীনের অভিজ্ঞতা দেখায় যে AI-এর গণতন্ত্রীকরণ সম্ভব—যদি প্রযুক্তি উন্মুক্ত হয়, শাসন কাঠামো ন্যায্য হয়, এবং এর প্রয়োগ সমাজেরসকল স্তরের উপকারে আসে।
খেলার নিয়ম বদলে যাচ্ছে। প্রশ্নটি আর শুধু AI ব্যবহারের নয়—বরং কার শর্তে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে।
অনুবাদকঃ
ড. সুশান্ত দাস ও আহমেদ বোরহান,
সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চ, ঢাকা, বাংলাদেশ ।
Source: alai

