গণিতের দীর্ঘতম হিসাব: গুহা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত
আজ যদি প্রফেসর গৌরাংগ দেব রায় বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো বলতাম, ‘দাদা, ভালো করে মানব সভ্যতার ‘গণিতের ইতিহাসটা’ লিখুন দেখি। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, ওটা আপনি আমার চেয়ে ভালো লিখবেন। তিনি অংকটা জানতেন গভীরভাবে এবং গভীর মমতায়। তাঁর যারা ছাত্র ছাত্রীরা (যারা অনেকে আমারো ছাত্র ছাত্রী) আজ পৃথিবী ব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা গবেষণা করছে, তাঁরা জানে প্রফেসর গৌরাংগ দেবরায় তাদেরকে কি দিয়ে গেছেন। প্রফেসর গৌরাংগ দেব রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতে যেয়ে। তারপর বহু ইতিহাস। আর একদিন আলাদা লিখতে হবে। আজ বাংলাদেশে যারা গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে যুক্ত তাঁদের অনেকে জানেন , অনেকে জানেন না বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াড শুরু হয়েছিল প্রফেসর ্গৌরাংগ দেব রায়ের সভাপতিত্বে। সেটাও অনেক বড় ইতিহাস। আমি যেহেতু অংকের ছাত্র না হয়েও তার সঙ্গে কিঞ্চিত যুক্ত ছিলাম, তাই কিছুটা জানি। প্রফেসর জাফর ইকবাল, প্রফেসর কায়কোবাদ যারা একে ইতিহাসের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা অনেকে স্বীকার না করলেও, তাতো ইতিহাস। আরও অনেকেই আছেন বা ছিলেন, তাঁদের নাম এখানে লিখলাম না বলে তাঁদের ভূমিকা কম তা নয়। এটুকু লিখলাম এজন্য যে, আজ হঠাৎ করে আমার এক বন্ধুর অনুরোধে অংক এবং তাঁর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা বলবো তাই। কদিন থেকেই কোয়ান্টাইজেশনের উপর পড়াশুনা করতে যেয়ে ডিরাক আর ক্লেন –গর্ডন সমীকরণ পড়ছিলাম। কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডইনামিক্স, কোয়ান্টাম ক্রমোডাইনামিক্স, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির কিছু বিষয় দেখে মনে পড়লো, আজ অংকের বন্ধুরা পাশে থাকলে আমার অনেক জটিলতা হয়তো সহজে সমাধান করতে পারতাম। এটুকু কথা বলেই গণিতের ইতিহাসের কিছু গল্পকথা বলছি, যাতে যারা এ বিষয়ে সত্যিকারের পন্ডিত, তাঁরা যেন এগিয়ে আসেন।
গণিতের দীর্ঘতম হিসাব: গুহা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত
গণিতকে অনেকেই ভয় পায়। শুকনো সূত্র, অক্ষর-চিহ্নের জটিল জাল। কিন্তু গণিতের আসল ইতিহাস কিন্তু রোমাঞ্চকর। এটি কয়েক হাজার বছরের এক অভিযানের কাহিনি—যেখানে শুরুটা ছিল মাটির টোকেন, ভেড়া গোনা, আর নীল নদের প্লাবন। আর আজ আমরা পৌঁছে গেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটারে। এই লেখায় আমরা ঘুরে দেখব সেই পথটুকু, খুব সহজ ভাষায়।
১. শুরুটা কাঁচা মাটিতে (আজ থেকে ২০,০০০ বছর আগে)
গণিতের প্রথম চিহ্ন পাওয়া যায় একটি বাঁদরের হাড়ে (ইশাঙ্গো হাড়)। তাতে দাগ কাটা—কেউ দিন বা পশু গুনছে। এটাই প্রথম ‘গণনা’। তারপর মানুষ বুঝতে শিখল, ৩টি পাথর আর ৩টি ফল এর মধ্যে আসলে একটা জিনিস একই আছে, তাহলো—‘৩’। এই বিমূর্ত ধারণাটাই গণিতের ভিত।
প্রাচীন মিশরে নীল নদ বান এলে জমির সীমানা মুছে যেত। আবার সীমানা বানাতে গিয়ে মানুষ আবিষ্কার করল জ্যামিতি। একটা দড়িতে ১২টি গিঁট দিয়ে ৩-৪-৫ দৈর্ঘ্যের দড়ি বানালেই সমকোণ পাওয়া যায়। এই ছিল প্রথম ‘থিওরেম’, যদিও তখন কেউ ওই নাম জানত না।
এই যুগে তাই সবচেয়ে বড় অর্জন সংখ্যার ধারণা। ‘তিন’ মানে তিনটা পাথর, না তিনটা ভেড়া নয়—শুধু তিন। এই তিন এর ধারণা বোঝাটাই গণিতের আদিম মাতা।
২. ব্যাবিলনের হিসাবরক্ষক (৪,০০০ বছর আগে)
মেসোপটেমিয়ায় বড় বড় শহর গড়াল। সেখানে কর, বাণিজ্য, জ্যোতির্বিদ্যা—সব কিছুর জন্য দরকার পড়ল হিসাবের। ব্যাবিলনীয়রা লিখত নরম মাটির ট্যাবলেটে। তারা আবিষ্কার করল ‘স্থানীয় মান’ পদ্ধতি (যার দরুন ১, ১০, ১০০ এর মান আলাদা হয়)। তারা দ্বিঘাত সমীকরণ (ax²+bx+c=0) সমাধান করতে জানত। শুধু জানত না, বর্গমূল বের করত ছয় দশমিক পর্যন্ত!
কিন্তু এগুলো ছিল ‘রান্নার বইয়ের রেসিপি’—কী করতে হবে বলা আছে, কেন করতে হবে তার ব্যাখ্যা নেই।
এর মধ্য দিয়েই লিখিত গণিতের জন্ম। এবং ৬০ ভিত্তিক পদ্ধতি তার বড় মাইলস্টোন (যার কারণেই আজও ঘণ্টায় ৬০ মিনিট ধরা হয়) ।
৩. গ্রিসের ‘কেন?’ প্রশ্ন (২,৫০০ বছর আগে)
গ্রিক দার্শনিক থেলিস একদিন বললেন, ‘দুটি সমকোণ পরস্পর সমান—এটা জানা থাকলেও জানতে হবে কেন এটা সত্যি।’ এই ‘কেন’ প্রশ্নটাই গণিতকে বদলে দিল। গ্রিকরা চাইল যুক্তি ও প্রমাণ। ধরে নাও কয়েকটি মৌলিক সত্য (axiom), তারপর ধাপে ধাপে বের করে নাও সবকিছু।
ইউক্লিড লিখলেন ‘এলিমেন্টস’ নামের বই—একটি বই যাতে ৪৬৫টি উপপাদ্য মাত্র ৫টি মৌলিক সত্য থেকে প্রমাণ করা হয়েছে। এই বই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ছাপা বই এর মধ্যে অন্যতম । আর পিথাগোরাস দিলেন তাঁর বিখ্যাত সূত্র (a²+b²=c²)।
এর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় অর্জন: প্রমাণের ধারণা। আগে শুধু ‘হিসাব করতে জানা’, এখন ‘কেন সেটা সত্যি, তা যুক্তি দিয়ে বোঝানো’।
৪. শূন্যের উপহার: ভারত থেকে বাগদাদ (আনুমাণিক ১,৫০০ বছর আগে)
গ্রিকরা শূন্যকে ভয় পেত—‘অভাব’ কিভাবে সংখ্যা হয়? রোমানদেরও শূন্য ছিল না। এই শূন্যকে বাঁচালেন ভারতীয় গণিতবিদেরা। তারা শূন্যকে একটি পূর্ণ সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করলেন। ব্রহ্মগুপ্ত (৭ম শতক) লিখলেন শূন্য ও ঋণাত্মক সংখ্যার (‘ঋণ’) পাটিগণিতের সূত্র।
তারপর বাগদাদের জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রে আল-খোয়ারিজমি লিখলেন ‘আল-জাবর ওয়াল মুকাবালা’ নামের বই। এই ‘আল-জাবর’ থেকেই ‘বীজগণিত’ (algebra) শব্দটি এসেছে। তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে সমীকরণের পক্ষান্তর করতে হয়। তাঁর আরেক বই থেকে ‘অ্যালগরিদম’ (algorithm) শব্দটি এলো।
একদম সাধারণ মানুষ যাতে বোঝে—ভারতীয় দশমিক পদ্ধতি (০,১,২,…,৯) ইউরোপে পৌঁছে দিলেন ফিবোনাচ্চি (১২০২ সালে)। রোমান সংখ্যায় এক ঘণ্টার হিসাব এখন হয়ে গেল মিনিটে।
এই যুগে সবচেয়ে বড় অর্জন: শূন্য। আর দশমিক পদ্ধতি। বীজগণিতের জন্ম।
৫. কামানের গোলা আর ক্যালকুলাস (৪০০ বছর আগে)
রেনেসাঁর ইউরোপে কামানের গোলা বাতাসে উড়ছে। মুহূর্তে মুহূর্তে তার বেগ বদলাচ্ছে। এই বদলকে গণিতে আনার চেষ্টা করলেন ডেকার্তে। তিনি একটা গ্রিড আঁকলেন (স্থানাঙ্ক জ্যামিতি)—যাতে বীজগণিত ও জ্যামিতি এক হলো। যেকোনো সমীকরণ এখন ছবি (গ্রাফ)।
তারপর এলেন আইজাক নিউটন (প্লেগের সময় বাড়িতে বসে) এবং গটফ্রিড লাইবনিজ (চমৎকার প্রতীকপদ্ধতি নিয়ে)। তারা দু’জন আলাদাভাবে আবিষ্কার করলেন ক্যালকুলাস। ক্যালকুলাসের সাহায্যে আমরা জানতে পারি:
· যেকোনো মুহূর্তে গতিবেগ কত (ডেরিভেটিভ)
· কোন বাঁকা ক্ষেত্রের আয়তন কত (ইন্টিগ্রাল)
ক্যালকুলাস ছাড়া পদার্থবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং, রকেট বিজ্ঞান কিছুই সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় অর্জন: গতিশীল জগতকে গণিতের ছাঁচে ফেলা। পরিবর্তনকে পরিমাপ করা।
৬. জুয়ার সূত্র থেকে স্ট্যাটিস্টিকস (৩০০ বছর আগে)
১৬৫৪ সালে ফরাসি গণিতবিদ প্যাসকেল ও ফার্মা জুয়া খেলার একটি সমস্যা নিয়ে চিঠি বিনিময় করছেন। সেখানেই জন্ম হলো সম্ভাবনা তত্ত্বের। আজ এই তত্ত্ব বীমা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, এমনকি মেশিন লার্নিং-এর ভিত।
একই সময়ে মানুষ বুঝল ইউক্লিডের জ্যামিতি একমাত্র জ্যামিতি নয়। গোলক বা ঘোড়ার জিনের (স্যাডল) পৃষ্ঠে ত্রিভুজের কোণের সমষ্টি ১৮০° না-ও হতে পারে। এই অদ্ভুত জ্যামিতি পরে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বে কাজে লাগে। যাকে বলা হয় রিম্যানিয়ান জ্যামিতি।
আর জার্মান গণিতবিদ ক্যান্টর দেখালেন অসীমেরও নানা আকার আছে। পূর্ণ সংখ্যার অসীমের চেয়ে বাস্তব সংখ্যার অসীম বড়। এই কথা শুনে অনেকে হেসেছিলেন, আজ সেটাই গণিতের ভিত।
সবচেয়ে বড় অর্জন: সম্ভাবনা, অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি, অসীমের শ্রেণিবিভাগ।
আর এই সংখ্যার গণিতের কথা হলে রামানুজমের কথাও ইতিহাসের অংশ।
৭. কম্পিউটারের যুগ (গত ১০০ বছর)
১৯৩১ সালে গ্যোডেল দেখিয়ে দিলেন এমন কিছু গাণিতিক সত্য আছে যেগুলো প্রমাণ করা যায় না—সেই ব্যবস্থার ভিতরে থেকে। গণিতেরও সীমা আছে।
কিন্তু একই সময়ে অ্যালান টুরিং কল্পনা করলেন একটি সরল যন্ত্র (টুরিং মেশিন) যা যেকোনো ‘হিসাব করা যায় এমন জিনিস’ হিসাব করতে পারে। সেই কল্পনার যন্ত্রটিই আজকের কম্পিউটার। গণিত থেকে জন্ম নিল কম্পিউটার বিজ্ঞান, তারপর ইন্টারনেট, তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
আজ গণিত লুকিয়ে আছে আপনার ফোনের জিপিএসে (গ্রাফ থিওরি), ডাক্তারির স্ক্যানারে (র্যাডন ট্রান্সফর্ম), আবহাওয়ার মডেলে (আংশিক ডিফারেনশিয়াল সমীকরণ)।
সবচেয়ে বড় অর্জন: অ্যালগরিদম ও কম্পিউটেশন। ‘হিসাব করাকে’ গণিতের প্রধান বিষয় করা।
পরিশেষে: একটি কথা
যদি জিজ্ঞেস করেন, গণিতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কোনটি? উত্তর কিন্তু ক্যালকুলাস বা শূন্য নয়। উত্তর হচ্ছে বিমূর্ত করার ক্ষমতা—কোনো জিনিসের গুণ বা সংখ্যাকে আলাদা করে দেখার মানসিক শক্তি। সেই শক্তি দিয়েই মানুষ পাথরের টোকেন থেকে পৌঁছে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়।
গণিত মরে না। এর গল্প এখনো লেখা হচ্ছে। হয়তো আপনিও, আপনার স্মার্টফোনের পর্দায়, সেই গল্পের এক ক্ষুদ্র অংশ লিখছেন এখন।
যা লেখা হলো, তা ইতিহাস তো নয়ি, গণিতও নয়। এটা শুধু কৌতুহলে গণিতকে দেখা।
পাঠক যদি আরও জানতে চান, সরল ইংরেজিতে জর্জ জোসেফের ‘The Crest of the Peacock’ এর মতো অনেক বই আছে দেখতে পারেন।
Dr. Susanta Das’s facebook post

