Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

চার্জ বা আধান কি?

চার্জ বা আধান কি?

যারা পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী তাঁরা তো বটেই, সাধারণভাবে যারা বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত তাদের কাছেও বৈদ্যুতিক আধান বা চার্জপরিচিত একটি নাম। আর বিদ্যুত যখন ঘরে ঘরে তখন চার্জের নাম সাধারণ মানুষের কাছেও এর পরিচিত-প্রতিদিনের । মোবাইল চার্জকরা, রিক্সাচালকের রিক্সার ব্যাটারি চার্জ করা এখন এক নৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, চার্জ কি, তাহলে এমনভাবে তাকাবে যেন এ পাগল এলো কোথা থেকে? কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয়, বিগত সাড়ে ছয় দশক ধরে আমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছি, চার্জকি-আমি এখনো পুরো উত্তর পাইনি। এখনো উত্তর খুঁজছি।

আমার মনে হয় বস্তুর ভর এবং বিদ্যুৎ চার্জ পদার্থবিজ্ঞানের এক গভীর ও রহস্যময় ধারণা। ভরের বিষয়টা পরে আসবো অন্যদিন, দেখাযাক চার্জ সম্পর্কে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের ইতিহাস কি বলে।
প্রতিটি বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গে, আলোর প্রতিটি রশ্মিতে, আর কণার মধ্যে প্রতিটি বলের পেছনে এই চার্জ কাজ করে।
কিন্তু এর গল্প শুরু হয়েছিল অনেক প্রাচীন সময়ে, খুব সহজ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে।

বিজ্ঞান জন্ম নেওয়ার অনেক আগে মানুষ দেখেছিল, কিছু বস্তু ঘষলে তা  হালকা জিনিসকে টেনে নেয়।
খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫৮৫ সালে গ্রিক দার্শনিক Thales of Miletus লক্ষ্য  করেন যে অ্যাম্বার (গ্রিক ভাষায় যাকে ēlektron বলা হতো) কাপড়দিয়ে ঘষলে খড়ের ছোট টুকরোকে আকর্ষণ করে।

এটি ছিল আজ আমরা যাকে বিদ্যুৎ চার্জ বলি তার প্রথম দিকের পরিচিত উদাহরণ।
তখন অবশ্য এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না।

উনিশ শতকে James Clerk Maxwell বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের জন্য পূর্ণাঙ্গ সমীকরণ তৈরি করেন।

তিনি দেখান, বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব আসলে একই মৌলিক ক্ষেত্রের ভিন্ন রূপ।
তার সমীকরণগুলো বলল—

  • বৈদ্যুতিক চার্জ বিদ্যুৎ ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।
  • চলমান চার্জ (বিদ্যুৎ প্রবাহ) চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে।
  • পরিবর্তিত ক্ষেত্র থেকে তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে।

এই কাজের মাধ্যমে চার্জকে বোঝার একটি পরিণত বৈজ্ঞানিক কাঠামো তৈরি হয়।
চার্জকে তখন ক্ষেত্রের উৎস ও ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়াশীল একটি সত্তা হিসেবে বোঝা হয়।

বিশ শতকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে বিদ্যুৎ অবিচ্ছিন্ন নয়।
এটি কণার মাধ্যমে ছোট ছোট নির্দিষ্ট অংশে বহন হয়।

  1. J. Thomson ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন।
    দেখা যায়, ইলেকট্রন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণাত্মক চার্জ বহন করে।

এরপর প্রোটন ও অন্যান্য কণার মধ্যে ধনাত্মক চার্জ পাওয়া যায়।
এভাবেই “প্রাথমিক চার্জ” বা elementary charge-এর ধারণা জন্ম নেয়।
এটি হলো চার্জের ক্ষুদ্রতম একক।

১৯১৮ সালে গণিতবিদ Emmy Noether একটি যুগান্তকারী সত্য প্রমাণ করেন।
তিনি দেখান, প্রকৃতির প্রতিটি সংরক্ষণ সূত্র একটি সাম্য (symmetry) থেকে আসে।

  • সময়ের সাম্য থেকে শক্তি সংরক্ষণ।
  • স্থানের সাম্য থেকে ভরবেগ সংরক্ষণ।
  • আর বিশেষভাবে, গেজ সাম্য থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ সংরক্ষণ।

এর কিছু পর Hermann Weyl চার্জ সংরক্ষণকে আরও গভীর সাম্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি প্রস্তাব করেন, যদি কোয়ান্টাম তরঙ্গের ফেজ নির্দিষ্টভাবে বদলালেও পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ অপরিবর্তিত থাকে, তবে সেটিইএকটি মৌলিক সাম্য।
এই ধারণাই পরে “গেজ সাম্য” নামে পরিচিত হয়।

আজকের আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে এই সাম্যকে একটি গাণিতিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, যার নাম U(1) gauge symmetry।
এই সাম্য থেকেই বোঝা যায়, চার্জ অবশ্যই সংরক্ষিত থাকবে।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও আপেক্ষিকতাবাদ একত্র হয়ে তৈরি করে কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা বা Quantum Electrodynamics (QED)।

এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, ইলেকট্রনের মতো চার্জযুক্ত কণা কীভাবে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়া করে।

এখানে ফোটনের অস্তিত্ব এবং তার কণার সঙ্গে সম্পর্ক গেজ সাম্য থেকেই আসে।
যদি স্থানভেদে ফেজ পরিবর্তন হলেও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম একই থাকে, তবে সেই সাম্য রক্ষা করতে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্বপ্রয়োজন।

সংক্ষেপে—

  • চার্জ শুধু কণার একটি গুণ নয়।
  • চার্জ প্রকৃতির গভীর সাম্যের প্রতিফলন।
  • ক্ষেত্র ও কণার মিথস্ক্রিয়া গেজ সাম্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

এই ধারণা আজ Standard Model-এর কেন্দ্রে রয়েছে।

গেজ সাম্য শুধু তড়িৎচৌম্বক বলের জন্য নয়।
বিশ শতকের মাঝামাঝি Chen-Ning Yang এবং Robert Mills এই ধারণাকে প্রসারিত করেন।

তারা শক্তিশালী ও দুর্বল নিউক্লীয় বলের ক্ষেত্রেও গেজ সাম্যের ধারণা প্রয়োগ করেন।
এখানে চার্জের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে “কালার চার্জ”-এর মতো নতুন রূপ পায়।

পরে বিজ্ঞানীরা এমন তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, যেমন Grand Unified Theory (GUT), যেখানে সব বল ও চার্জ একটি একক সাম্য থেকে উদ্ভূতহতে পারে।

চার্জের গল্প শুরু হয়েছিল ঘষা অ্যাম্বার দিয়ে।

ধ্রুপদী পদার্থবিজ্ঞান ক্ষেত্রের মাধ্যমে চার্জ ব্যাখ্যা করেছে।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান দেখিয়েছে, চার্জ বিচ্ছিন্ন এককে আসে এবং সাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

গেজ সাম্য দেখায়, প্রকৃতির নিয়ম নির্দিষ্ট রূপান্তরের পরেও একই থাকে।

আজ আমরা বুঝি, চার্জ শুধু কণার একটি বৈশিষ্ট্য নয়।
এটি প্রকৃতির গভীর সাম্যের এক জানালা।
এই সাম্যই সংরক্ষণ নীতি নির্ধারণ করে এবং বলের গঠনকে রূপ দেয়।

Leave a comment

Bridging Science, Technology, and the Social Fabric

Newsletter Signup
Say Hello

Design by: Iftekhar Hossain  © Centre for Social Research-CSR 2026. All Rights Reserved.

From Physical Laws to Social Justice: Empowering the Analytical Mind.