মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। এ নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নাই। সেটাই স্বাভাবিক। মানুষ যতক্ষণ না তার চিন্তা, জ্ঞান বা বোধের মধ্যে কোন বিষয়কে আনতে পারে ততক্ষণ তা চলতে থাকে। এটাই চিন্তার প্রবহমানতা। একটা শেষ তো আরেকটা শুরু। এখন পর্যন্ত আলোচিত বা অধিকাংশ পন্ডিতরা যাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, তাতে বলা হয়, মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরু এক মহাজাগতিক ঘটনা ‘মহাবিস্ফোরণ’ বা বিগ ব্যাংগের মধ্য দিয়ে। এই ধারণা যেমন একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়, তেমনি সৃষ্টি করে আরো অনেক অমিমাংসিত প্রশ্নের। অধ্যাপক পেন রোজের মত বিজ্ঞানী বলেছেন, বিগ ব্যাং আসলে শুরু নয়, সেটা আগের প্রক্রিয়ার শেষ। তাছাড়া বিগ ব্যাং তত্বকেই পরিশীলিত করা হয়েছে, ইনফ্লেশন তত্ব দিয়ে। তারপরও প্রশ্নের শেষ নেই। যেমন স্থান ও কাল যদি পূর্বনির্ধারিত না হয় তাহলে তা কি ভাবে তৈরি হয়েছে? প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞান বলে ‘এন্ট্রপি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চালক। আদিতে এই এন্ট্রপির রূপ বা পরিমাণ কি ছিল। এটার পরিমাণ কি বেশী ছিল না কি কম? কম হলেও তার পরিমাণ কত? আমরা যাকে আদি কণা ( Elementary particle ) বলি, তার ভর কি ভাবে তৈরি হয়েছিল? এই ভর পাওয়ার আগের পরিস্থিতি কি ছিল? এখন বিজ্ঞানে যাকে সময়ের তীর বা টাইম এ্যারো বলা হয় যা এন্ট্রপির সংগে সম্পর্কিত তাকে কি ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে যে বৈজ্ঞানিক ধারণা বা গাণিতিক নিয়ম, তা কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ তো নয়ই, বরং খুবই জটিল এবং নতুন ধারণা তত্ব ও গাণিতিক রূপ প্রয়োজন। তাই, তার একটা বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তা প্রস্তুত করতে পারি কি না দেখা যাক। এই ধারণাটা আমার নিজস্ব। একে বৈজ্ঞানিক তত্বে রূপ দিতে গেলে এর গাণিতিক রূপ দিতে হবে। তার থেকে কোন ভবিষ্যত বাস্তবতা বা পরিক্ষণযোগ্য বিষয় অনুমান করতে হবে, যাতে সেই পরীক্ষা এই ধারণাকে ভুল বা সঠিক প্রমান করতে পারে। এটা একটা বৈজ্ঞানিক নিয়ম। তাই এই ধারণা একটি দীর্ঘ গবেষণার অংশ। তা চলতে থাকবে এবং চলছে।
শূন্য থেকে অভিকর্ষীয় জ্যামিতি: সমতা, এনট্রপি ও স্থানকালের জন্ম নিয়ে এক দার্শনিক ভাবনাঃ
এক সময় পদার্থবিজ্ঞানে মনে করা হতো, স্থান ও কাল চিরন্তন মঞ্চ বা প্ল্যাটফরম। সেই মঞ্চের ওপর বস্তুজগতের নাটক চলছে।নিউটন স্থান ও কালকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় বলে ভাবতেন। আইনস্টাইন সেই ধারণা বদলে দেন। স্থান ও কাল আর স্থির রইল না।তারা হয়ে উঠল গতিশীল, নমনীয়, সাড়া-দেওয়া বাস্তবতা। বস্তু স্থানকালকে বলে দেয় কীভাবে বাঁকতে হবে। আর বাঁকানো স্থানকালবস্তুজগতকে বলে দেয় কীভাবে চলতে হবে।
কিন্তু আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এখন আরও গভীর প্রশ্ন করছে। যদি স্থানকাল নিজেই মৌলিক না হয়? যদি সেটিও আরও গভীরকিছু থেকে জন্ম নেয়?
সংরক্ষণ সূত্রের ( Law of Conservation) অন্তর্নিহিত অর্থঃ
আমরা ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান পড়তে যেয়ে শিখি, শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। এটিই শক্তির সংরক্ষণ সূত্র। বিজ্ঞানের সবচেয়েনির্ভরযোগ্য নীতিগুলোর একটি এটি।
কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে এমি নোয়েদার নামে এক তাত্বিক বিজ্ঞানী এক বিস্ময়কর সত্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন সংরক্ষণ সূত্রপ্রকৃতির হঠাৎ পাওয়া নিয়ম নয়। এগুলো আসে সমতা বা সিমেট্রি থেকে। এটাই Noether’s Theorem এর মূল কথা।
যদি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম সময়ের সঙ্গে না বদলায়, তবে শক্তি সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে,
যদি নিয়ম স্থানভেদে না বদলায়, তবে ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে।
অর্থাৎ সমতা থেকেই সংরক্ষণ জন্ম নেয়।
কিন্তু এখানেই একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। যদি শক্তি সংরক্ষণ সময়ের সমতা থেকে আসে, তবে সময় নিজে যখন ছিল না, তখন কীঘটেছিল? এটি একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।
আধুনিক মহাকাশবিদ্যা (কসমোলজি) বলে, সময়েরও একটি শুরু আছে। যদি তা-ই হয়, তবে সময়ের আগে শক্তির সংরক্ষণ অর্থহীন।তাহলে সংরক্ষণ সূত্র হয়তো চিরন্তন নয়। এগুলো হয়তো মহাবিশ্বের উদ্ভূত বৈশিষ্ট্য।
মাধ্যাকর্ষণ কোনো বল নয়ঃ
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মাধ্যাকর্ষণের ধারণা বদলে দেয়। এটি আর সাধারণ বল নয়। এটি স্থানকালের জ্যামিতি।ভারী বস্তু স্থানকালকে বাঁকায়। আর মুক্তভাবে চলা বস্তু সেই বাঁকানো পথে চলে।
অন্যদিকে কণা পদার্থবিজ্ঞান দেখায়, ভরও মৌলিক নয়। হিগস প্রক্রিয়া ( Higg’s Mechanism) বলে, কণারা স্বতঃস্ফূর্ত সমতা ভঙ্গের (Sponteneous Symmetry Breaking ) মাধ্যমে ভর অর্জন করে। মহাবিশ্ব প্রথমে ছিল অত্যন্ত সমতাপূর্ণ। পরে তা ঠান্ডা হয়। সমতাভাঙে। ভরের উদ্ভব হয় এবং মহাবিশ্ব আইনস্টাইন যুগে প্রবেশ করে । এর আগে মহাবিশ্ব ছিল প্লাংক যুগে। তাহলে সংক্ষেপে বলা যায়,
ভর স্থানকালকে বাঁকায়।
বাঁকানোই মাধ্যাকর্ষণ।
আর সমতা ভঙ্গ ভর সৃষ্টি করে।
অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণও পরোক্ষভাবে সমতা ভঙ্গের ফল। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। স্থানকাল নিজে কোথা থেকে এলো?
মাধ্যাকর্ষণীয় জ্যামিতির আগে কোয়ান্টাম জড়াজড়ি বা জটজাল ( Quantum Entanglement):
কোয়ান্টাম মাধ্যাকর্ষণের কয়েকটি তত্ত্ব এখন বলছে, স্থানকাল আরও গভীর এক স্তর থেকে জন্ম নিতে পারে। সেই স্তরটি কোয়ান্টামগঠনবিশিষ্ট।
লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি ধারণামতে স্থানকাল গঠিত হয় স্পিন নেটওয়ার্ক নামের বিমূর্ত গ্রাফ থেকে। হলোগ্রাফিক দ্বৈততা ধারণা দেয়, স্থানকালের জ্যামিতি জন্ম নেয় কোয়ান্টাম জড়াজড়ির বিন্যাস থেকে। টেনসর নেটওয়ার্ক মডেলে স্থানীয় সংযোগ প্রতিফলিত করেকোয়ান্টাম অবস্থার জড়াজড়ি বা জটজাল।
একটি অসাধারণ ধারণা সামনে আসে যে, জড়াজড়ি বা জটজালই স্থানকাল তৈরি করে।
দুটি অঞ্চল যদি জড়াজড়ি অবস্থায় থাকে, তবে তারা জ্যামিতিকভাবে সংযুক্ত।
জড়াজড়ি কমে গেলে স্থানকাল ছিন্নভিন্ন হতে পারে।
তাহলে হয়তো ক্লাসিক্যাল স্থান ও সময়ের আগে ছিল একটি বিশুদ্ধ কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক। ছিল এক প্রাক-জ্যামিতিক জটজাল ( Entanglement ) গ্রাফ।
সবচেয়ে ছোট সূচনাঃ
সবচেয়ে ছোট ভৌত “অবস্থা” কী?
তথ্য তত্ত্বে এনট্রপির সবচেয়ে ছোট একক হলো
S = k_B ln 2
এটি একটি বাইনারি পছন্দের সমান। একটি মাত্র বিট।
হয়তো আদিম মহাবিশ্ব পুরোপুরি “শূন্য” ছিল না। ছিল ক্ষুদ্রতম তথ্যগত পার্থক্য। ছিল দুই-অবস্থার একটি কোয়ান্টাম ব্যবস্থা।
এটি ফাঁকা ছিল না। কিন্তু প্রায় কাঠামোহীন।
এটি স্থানে প্রসারিত ছিল না, কারণ স্থান তখনও জন্মায়নি।
এটি সময়ে বিবর্তিত হচ্ছিল না, কারণ সময় তখনও আলাদা হয়ে ওঠেনি।
এই ক্ষুদ্র এনট্রপি থেকেই জটিলতা বাড়তে পারে।
এনট্রপি বৃদ্ধি মানেই শুধু বিশৃঙ্খলা নয়। এটি পার্থক্য সৃষ্টি।
জড়াজড়ির ( Entanglement ) ধরন যত জটিল হয়, কার্যকর জ্যামিতি তত গড়ে উঠতে পারে।
আমরা বৃহৎ স্কেলে তাকিয়ে সেই সম্পর্কগুলোকেই স্থান হিসেবে দেখি।
সম্পর্কের পরিবর্তনকেই সময় হিসেবে ব্যাখ্যা করি।
স্থানকালের তাপগতিবিদ্যাঃ
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এক গভীর আবিষ্কার এই ধারণাকে শক্তি দেয়। টেড জ্যাকবসন দেখিয়েছিলেন, আইনস্টাইনের ক্ষেত্র সমীকরণতাপগতিবিদ্যার যুক্তি থেকে বের করা যায়। মাধ্যাকর্ষণ অনেকটা পদার্থের অবস্থা সমীকরণের ( Equation of State ) মতো আচরণ করে।
এরিক ভার্লিন্ডে পরে প্রস্তাব করেন, মাধ্যাকর্ষণ হতে পারে একটি এনট্রপি-জনিত বল। এটি অণুস্তরের পরিসংখ্যানগত আচরণ থেকেউদ্ভূত।
যদি মাধ্যাকর্ষণ তাপগতিবিদ্যাগত হয়, তবে জ্যামিতিও হতে পারে পরিসংখ্যানগত।
আর যদি জ্যামিতি পরিসংখ্যানগত হয়, তবে স্থানকাল তা থেকে উদ্ভূত।
তাহলে মহাবিশ্বের জন্ম মানে শুধু বস্তুর আবির্ভাব নয়।
এটি কোয়ান্টাম তথ্য থেকে স্থানকালের আবির্ভাব।
হয়ে ওঠার একটি সম্ভাব্য গল্পঃ
আমরা সতর্কভাবে একটি ধারাবাহিকতা কল্পনা করতে পারি: মহাবিশ্বের আদিতে
- একটি প্রাক-জ্যামিতিক কোয়ান্টাম গ্রাফ সমতাপূর্ণ অবস্থায় ছিল।
• ন্যূনতম তথ্যগত এনট্রপি (k_B ln 2) ছিল প্রথম পার্থক্য ( First Difference)।
• অস্থিতিশীলতা সমতা ভঙ্গ ঘটায়।
• জড়াজড়ির বিন্যাস বদলে যায়।
• বৃহৎ স্কেলে কার্যকর জ্যামিতি গড়ে ওঠে।
• সময়ের সমতা দেখা দেয়।
• নোয়েদারের উপপাদ্য কার্যকর হয়।
• সংরক্ষণ সূত্র অর্থপূর্ণ হয়।
• হিগস-সদৃশ প্রক্রিয়ায় ভর সৃষ্টি হয়।
• স্থানকাল বাঁকে।
• মাধ্যাকর্ষণের জন্ম হয়।
এই দৃষ্টিতে মহাবিশ্ব শূন্য থেকে তৈরি নয়।
এটি কোয়ান্টাম সম্পর্কের গঠন থেকে ঘনীভূত।
মহাবিশ্ব সৃষ্টির এক বিকল্প ধারণা
পদার্থবিজ্ঞানের সীমানায় দর্শনঃ
এই ধারণা এখনো অনুমানভিত্তিক। এটি এখনই পরীক্ষায় যাচাইযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী দেয় না। কিন্তু এটি রহস্যবাদ ( Metaphysics) নয়।এটি প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞানের ওপর দাঁড়ানো। নোয়েদারের উপপাদ্য, স্বতঃস্ফূর্ত সমতা ভঙ্গ, কোয়ান্টাম জড়াজড়ি এবং তাপগতিবিদ্যাগতমাধ্যাকর্ষণ—সবই এর ভিত্তি।
যদি এই ধারণা সঠিক হয়, তবে সমতা বস্তু থেকে আগে। সম্পর্ক জ্যামিতি থেকে আগে। তথ্য পদার্থ থেকে আগে।
মহাবিশ্বের শুরু স্থান-কাল (Space-Time) ভিত্তিক কোনো বিন্দু ছিল না। কারণ তখন স্থান-কাল তৈরিই হয়নি।
এটি ছিল প্রথম সম্পর্কগত পার্থক্য। যাকে কোয়ান্টাম দ্বৈততা বলা যেতে পারে।
আর হয়তো সমগ্র অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতম বীজ ছিল একটি মাত্র বিট।
-S. K. Das Department of Physics Shahjalal University of Science and Technology (SUST), Sylhet, Bangladesh

