তাপমৃত্যুর পরেও: মহাজাগতিক পুনর্জন্মের একটি দ্বান্দ্বিক–সর্পিল (Dialectic Helical Model) মডেল
১,২এস. কে. দাস
১. শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, বাংলাদেশ
২. সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চ, ঢাকা, বাংলাদেশ
সারসংক্ষেপ
মহাবিশ্বের সম্ভাব্য তাপমৃত্যু (Heat Death) মডেলটি তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের একটি সুসংগত মহাজাগতিক সম্প্রসারণ। এইমডেল অনুসারে ভবিষ্যতে মহাবিশ্ব এমন এক অবস্থায় পৌঁছাবে যেখানে সমস্ত তাপগতীয় মুক্ত শক্তি নিঃশেষ হবে এবং সব বৃহৎ ভৌতপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এই ধারণা একটি দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। এটি মহাবিশ্বের জন্য একটি চূড়ান্ত স্থবিরসমাপ্তির কথা বলে, যা প্রকৃতির সর্বস্তরে দেখা গতিশীল ও প্রক্রিয়াধর্মী চরিত্রের সঙ্গে এক ধরনের বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।
এই প্রবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে সর্বোচ্চ এনট্রপির অবস্থা প্রকৃত অর্থে কোনো চূড়ান্ত সমতা নয়; বরং এটি একটি নতুন মহাজাগতিকপর্যায়ের সম্ভাব্য সূচনা। দ্বান্দ্বিক দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় “নেতিবাচনের নেতিবাচন”। এই ধারণা ব্যাখ্যা করার জন্য এখানেসময়ের হেলিকাল বা সর্পিল মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে ডি–সিটার শূন্যতার মধ্যে কোয়ান্টাম দোলন, পয়েনকারে পুনরাবৃত্তি উপপাদ্য, এবং সম্ভাব্য কোয়ান্টামগ্রাভিটি প্রক্রিয়া মিলিয়ে একটি নতুন মহাজাগতিক পর্যায়ের সূচনা ঘটতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র লঙ্ঘিত হয়না; কারণ পূর্ববর্তী মহাজাগতিক যুগের এনট্রপি ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ অবস্থায় থাকে এবং নতুন মহাবিশ্ব তার নিজস্ব এনট্রপি-যাত্রা শুরুকরে।
তাপগতিবিদ্যা, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান এবং দ্বান্দ্বিক দর্শনের ধারণাগুলিকে সমন্বিত করে এই প্রবন্ধে চিরন্তন মহাজাগতিক পুনর্জন্মেরএকটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূল শব্দ: তাপমৃত্যু, এনট্রপি, সময়ের তীর, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, হেলিকাল সময়, কোয়ান্টাম দোলন, মহাবিশ্বতত্ত্ব, পয়েনকারে পুনরাবৃত্তি, কনফর্মাল সাইক্লিক কসমোলজি।
১. ভূমিকা: চূড়ান্ততার প্যারাডক্স
তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক নীতি। এই সূত্র অনুযায়ী কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় এনট্রপিক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। মহাজাগতিক স্তরে এই সূত্র প্রয়োগ করলে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিত্র সামনে আসে—যাকে বলা হয় তাপমৃত্যু বাবিগ ফ্রিজ। এই অবস্থায় মহাবিশ্বে আর কোনো কার্যকর তাপগতীয় শক্তি অবশিষ্ট থাকবে না; নক্ষত্র নিভে যাবে, পদার্থ ছড়িয়ে পড়বেএবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব একটি প্রায় সমজাতীয় সাম্যাবস্থায় পৌঁছাবে (Adams & Laughlin, 1997)।
যৌক্তিক দৃষ্টিতে এই উপসংহার গ্রহণযোগ্য হলেও এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। প্রকৃতির সর্বত্র আমরা পরিবর্তন, রূপান্তর এবংগতিশীলতার উপস্থিতি দেখি। কোয়ান্টাম শূন্যতার ক্ষুদ্র দোলন থেকে শুরু করে গ্যালাক্সির জন্ম ও বিবর্তন—সবকিছুই প্রক্রিয়াধর্মী। সেইবাস্তবতার প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ স্থবির একটি চূড়ান্ত অবস্থা দার্শনিকভাবে সমস্যাজনক বলে মনে হয়।
এই প্রবন্ধের মূল অনুমান হলো: সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থার এই অবস্থা নিজেই একটি অস্থিতিশীল দ্বন্দ্ব। তাই তাপমৃত্যুকে চূড়ান্ত সমাপ্তিহিসেবে না দেখে এটিকে একটি নতুন রূপান্তরের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বান্দ্বিক ভাষায় এটি “নেতিবাচনেরনেতিবাচন” (Engels, 1883)।
এই সম্ভাবনাকে ব্যাখ্যা করতে হলে সময়কে সরলরৈখিক ধারায় নয়, বরং হেলিকাল বা সর্পিল কাঠামোতে কল্পনা করতে হয়। এইমডেলে নতুন মহাবিশ্বের জন্ম ঘটে পূর্ববর্তী মহাবিশ্বের উচ্চ-এনট্রপিযুক্ত অবস্থার কোয়ান্টাম দোলনের মধ্য থেকে।
২. দ্বান্দ্বিক কাঠামো: থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিনথেসিস
দ্বান্দ্বিক দর্শনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী বাস্তবতার বিকাশ ঘটে দ্বন্দ্ব ও রূপান্তরের ধারায়। বিশেষত “নেতিবাচনের নেতিবাচন” নীতিপ্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা (Ilyenkov, 1974)।
থিসিস: নিম্ন–এনট্রপির সূচনা
মহাবিশ্বের সূচনা, যা বিগ ব্যাং নামে পরিচিত, ছিল অত্যন্ত নিম্ন-এনট্রপিযুক্ত একটি অবস্থা। এই অবস্থায় পদার্থ ও শক্তি অত্যন্ত ঘন ওসুশৃঙ্খল ছিল। এই প্রাথমিক অবস্থাকেই মহাজাগতিক বিবর্তনের থিসিস বলা যেতে পারে (Penrose, 2010)।
অ্যান্টিথিসিস: তাপমৃত্যুর দিকে অগ্রগতি
মহাবিশ্বের পরবর্তী প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসকে দেখা যায় এই প্রাথমিক অবস্থার ক্রমাগত রূপান্তর হিসেবে। নক্ষত্র জন্মেছে ওনিভে গেছে, গ্যালাক্সি গঠিত হয়েছে ও বিচ্ছিন্ন হয়েছে, এবং এনট্রপি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি মূল নিম্ন-এনট্রপি অবস্থারধীরে ধীরে বিলোপ ঘটায়। এই পর্যায়টি দ্বান্দ্বিক ভাষায় অ্যান্টিথিসিস।
এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো তাপমৃত্যু—একটি অবস্থা যেখানে সমস্ত কাঠামো ও শক্তির পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়।
সিনথেসিস: সমতা থেকে নতুন সূচনা
দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় অ্যান্টিথিসিসও স্থায়ী নয়। এক সময় সেটিও অতিক্রান্ত হয় এবং তার মধ্য থেকেই একটি নতুন রূপ উদ্ভূত হয়। এইনতুন রূপই সিনথেসিস।
এই প্রবন্ধে প্রস্তাব করা হয়েছে যে তাপমৃত্যুর কোয়ান্টাম শূন্যতার মধ্য থেকেই একটি নতুন মহাজাগতিক পর্যায়ের সূচনা হতে পারে। এটিইনেতিবাচনের নেতিবাচন—যেখানে নিষ্প্রাণ সাম্যাবস্থা নতুন গতিশীল অস্তিত্বের সম্ভাব্য উৎসে পরিণত হয়।
৩. সম্ভাব্য প্রক্রিয়া: কোয়ান্টাম দোলন ও হেলিকাল সময়
এই রূপান্তরের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিহিত রয়েছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও মহাবিশ্বতত্ত্বের সংযোগস্থলে।
তাপমৃত্যুর অবস্থায় মহাবিশ্ব কোনো সম্পূর্ণ শূন্যতা নয়; বরং এটি একটি কোয়ান্টাম শূন্যতা। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুযায়ীএই শূন্যতার মধ্যেও ক্রমাগত ক্ষুদ্র দোলন ঘটে। এই দোলনের ফলে ভার্চুয়াল কণার ( microstate) জোড়া অল্প সময়ের জন্য সৃষ্টিহয় এবং আবার বিলীন হয়ে যায়।
অত্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এই দোলনগুলোর মধ্যে কিছু বিরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে পারে। পয়েনকারে পুনরাবৃত্তি উপপাদ্যঅনুযায়ী, কোনো সীমিত অবস্থা-স্থানের কোয়ান্টাম ব্যবস্থা পর্যাপ্ত সময় পেলে আবার প্রায় আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে আসতে পারে(Carroll & Chen, 2004)।
এই ধরনের একটি কোয়ান্টাম ঘটনা নতুন একটি ইনফ্লেশন বুদবুদ বা নতুন বিগ ব্যাং সৃষ্টি করতে পারে—যাকে কখনও বোল্টজমানমহাবিশ্ব বলা হয় (Dyson, Kleban & Susskind, 2002)।
এই প্রেক্ষাপটে হেলিকাল সময়ের ধারণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সরল চক্রাকার মডেল নয়। বরং এখানে প্রতিটি সর্পিল বৃত্ত একটিপূর্ণ মহাজাগতিক চক্রকে নির্দেশ করে—নিম্ন এনট্রপি থেকে সর্বোচ্চ এনট্রপি পর্যন্ত।
নতুন চক্র শুরু হলে পূর্ববর্তী মহাবিশ্বের এনট্রপি আর কমে না; সেটি সর্বোচ্চ অবস্থায় থেকেই যায়। নতুন মহাবিশ্ব তার নিজস্বএনট্রপি-প্রবাহ শুরু করে। ফলে প্রতিটি মহাবিশ্বের ভিতরে সময়ের তীর এবং দ্বিতীয় সূত্র অক্ষুণ্ণ থাকে, অথচ বৃহত্তর স্তরে মহাবিশ্বেরইতিহাস একটি অবিরাম সর্পিল প্রক্রিয়ায় বিস্তৃত হয়।
৪. আলোচনা: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্ভাব্য সাযুজ্য
এই দ্বান্দ্বিক-হেলিকাল ধারণার সঙ্গে আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের কয়েকটি তাত্ত্বিক প্রবণতার সাদৃশ্য দেখা যায়।
কনফর্মাল সাইক্লিক কসমোলজি (CCC): রজার পেনরোজ প্রস্তাব করেছেন যে একটি মহাজাগতিক যুগের অসীম প্রসারণ পরবর্তীযুগের বিগ ব্যাংয়ের সঙ্গে কনফর্মাল রূপান্তরের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারে (Penrose, 2010)।
কোয়ান্টাম গ্রাভিটি ও বিগ বাউন্স: লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটির মতো তত্ত্বে মহাবিশ্বের সংকোচন ও পুনঃপ্রসারণের সম্ভাবনা আলোচনাকরা হয়েছে।
ব্ল্যাক হোল কসমোলজি: একটি ধারণা অনুযায়ী ব্ল্যাক হোলের ভেতরের সিঙ্গুলারিটি নতুন মহাবিশ্বের জন্ম দিতে পারে (Smolin, 1992)। এতে একটি নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে একটি নতুন মহাজাগতিক সূচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বোল্টজমান ব্রেইন সমস্যা: কোয়ান্টাম দোলনের মাধ্যমে হঠাৎ স্বচেতন পর্যবেক্ষকের সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছে। যদিওএটি একটি তাত্ত্বিক সমস্যা হিসেবে বিবেচিত, তবু এটি দেখায় যে তাপমৃত্যুর শূন্যতা প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়; বরং এটি সম্ভাবনায়পূর্ণ।
৫. উপসংহার
মহাবিশ্বের তাপমৃত্যুকে অপরিবর্তনীয় সমাপ্তি হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে একটি বৃহত্তর দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করাযেতে পারে। এই দৃষ্টিতে তাপমৃত্যু মহাজাগতিক বিবর্তনের একটি অপরিহার্য ধাপ—অ্যান্টিথিসিস—যার মধ্য থেকেই নতুন সম্ভাবনারউদ্ভব ঘটতে পারে।
এই মডেলে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র লঙ্ঘিত হয় না। বরং এটি প্রতিটি মহাজাগতিক চক্রের ভিতরে কার্যকর থাকে, আর বৃহত্তর স্তরেমহাবিশ্ব একটি চিরন্তন হেলিকাল বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বিকশিত হয়।
এই প্রস্তাবনা অনুযায়ী তাপমৃত্যুর নাকচ হওয়া—অর্থাৎ নেতিবাচনের নেতিবাচন—ঘটে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্তর্নিহিতঅস্থিতিশীলতার মাধ্যমে, যার ফল হতে পারে একটি নতুন মহাবিশ্বের জন্ম।
অতএব মহাবিশ্বকে দেখা যেতে পারে এক চিরন্তন মহাজাগতিক প্রক্রিয়া হিসেবে, যেখানে মৃত্যু ও পুনর্জন্মের ধারাবাহিকতা সর্ববৃহৎ স্তরেঅব্যাহত থাকে।
ভবিষ্যৎ গবেষণায় বিশেষভাবে প্রয়োজন কোয়ান্টাম গ্রাভিটির সেই নীতিগুলির অনুসন্ধান, যা এই ধরনের মহাজাগতিক রূপান্তরকেব্যাখ্যা করতে সক্ষম হতে পারে এবং এই দার্শনিক অনুমানকে পরীক্ষাযোগ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে রূপ দিতে পারে।

