Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

সাদা গহ্বর (White Hole): মহাবিশ্বের রহস্যময় উল্টো দরজা

সাদা গহ্বর (White Hole): মহাবিশ্বের রহস্যময় উল্টো দরজা

-ড. এস. কে. দাস

একবার কল্পনা করুন—আপনি এমন এক মহাজাগতিক বস্তুর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে কিছুই ঢুকতে পারে না। আলো নয়, ধূলিকণা নয়, এমনকি একটি পরমাণুও নয়। অথচ সেই বস্তুটি অবিরাম আলো, শক্তি ও পদার্থ বাইরে ছুড়ে দিচ্ছে। এটি যেন মহাবিশ্বের একমুখী “নিঃসরণ-দ্বার”।

শুনতে কি বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগছে?

আশ্চর্যের বিষয়, এটি কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার (General Relativity) সমীকরণ থেকেই এমন এক বস্তুর সম্ভাবনা উঠে আসে। এর নাম সাদা গহ্বর বা হোয়াইট হোল (White Hole)

কৃষ্ণগহ্বর থেকে শুরু:

সাদা গহ্বর বুঝতে হলে আগে কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলকে একটু মনে করতে হবে।

যখন সূর্যের চেয়ে অনেক বড় একটি নক্ষত্র তার জ্বালানি শেষ করে নিজের মহাকর্ষের চাপে ভেঙে পড়ে, তখন এমন এক অঞ্চল সৃষ্টি হতে পারে যেখান থেকে আলোও বের হতে পারে না। এটিই কৃষ্ণগহ্বর। এর সীমানাকে বলা হয় ঘটনাদিগন্ত (Event Horizon)। এই সীমানা একবার অতিক্রম করলে আর ফিরে আসার উপায় নেই।

আইনস্টাইনের সমীকরণের আশ্চর্য ইঙ্গিত:

আইনস্টাইনের বিখ্যাত ক্ষেত্র সমীকরণ

G_{\mu\nu}+ Lambda g_{\mu\nu}=

{8\pi G}/{c^4}T_{\mu\nu}  বলছে, পদার্থ ও শক্তি স্থান-কালের বক্রতা সৃষ্টি করে। এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি সময়ের বিপরীতমুখী (time-reversal symmetry) রূপও গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ, যদি একটি সমাধানে সবকিছু কৃষ্ণগহ্বরের দিকে প্রবেশ করে, তবে আরেকটি গাণিতিক সমাধানে সবকিছু সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। এই উল্টো সমাধানই হলো সাদা গহ্বর

সাদা গহ্বর কী?

খুব সহজভাবে বলা যায়— কৃষ্ণগহ্বর হলো মহাজাগতিক একমুখী প্রবেশদ্বার। সাদা গহ্বর হলো মহাজাগতিক একমুখী নির্গমনদ্বার। পার্থক্যটি দেখুন—

কৃষ্ণগহ্বর                                                                  সাদা গহ্বর
সবকিছু ভেতরে যায় সবকিছু বাইরে আসে
আলো বের হতে পারে না                                                           আলো বের হয়
ভেতরে প্রবেশ সম্ভব ভেতরে প্রবেশ অসম্ভব
মহাকর্ষ আকর্ষণ করে                                        গাণিতিকভাবে বস্তু নির্গত হয়

অর্থাৎ, কৃষ্ণগহ্বর যেন মহাবিশ্বের “গিলে ফেলা মুখ”, আর সাদা গহ্বর যেন “উগরে দেওয়া মুখ”।

প্রকৃতিতে কি সত্যিই আছে?

এখানেই রহস্য। আজ পর্যন্ত হাজারো পর্যবেক্ষণে কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ কৃষ্ণগহ্বরের ছায়ার ছবি তুলেছে। LIGO ও Virgo মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ শনাক্ত করেছে। কিন্তু— আজ পর্যন্ত একটি সাদা গহ্বরও পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। অর্থাৎ, সাদা গহ্বর এখনো একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা

তাহলে বিজ্ঞানীরা কেন এটিকে গুরুত্ব দেন?

কারণ প্রকৃতির নিয়ম অনেক সময় গাণিতিক সমীকরণের মধ্যেই ভবিষ্যতের আবিষ্কারের ইঙ্গিত লুকিয়ে রাখে। একসময় কৃষ্ণগহ্বরকেও কেবল সমীকরণের অদ্ভুত সমাধান মনে করা হতো। আজ তা বাস্তব। তাই সাদা গহ্বরকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মহাবিশ্ব কি একটি বিশাল সাদা গহ্বর?

এই প্রশ্ন বহু বিজ্ঞানীকেই ভাবিয়েছে। বিগ ব্যাংয়ের শুরুতে অতি ক্ষুদ্র অঞ্চল থেকে বিপুল শক্তি বেরিয়ে এসেছে, স্থান নিজেই প্রসারিত হয়েছে, পদার্থ ও বিকিরণ সৃষ্টি হয়েছে। দেখতে অনেকটা সাদা গহ্বরের মতো। তবে বর্তমান মহাবিশ্বতত্ত্ব অনুযায়ী বিগ ব্যাংকে সরাসরি একটি সাদা গহ্বর বলা যায় না, কারণ এর জ্যামিতি ও বিবর্তন ভিন্ন। তবুও এই ধারণা গবেষণার এক আকর্ষণীয় ক্ষেত্র।

 

কৃষ্ণগহ্বর কি একদিন সাদা গহ্বরে পরিণত হতে পারে?

এটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রোমাঞ্চকর প্রশ্ন। স্টিফেন হকিং দেখিয়েছিলেন যে কৃষ্ণগহ্বর সম্পূর্ণ কালো নয়। কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে এটি খুব ধীরে বিকিরণ নির্গত করে। একে বলে হকিং বিকিরণ। কিছু আধুনিক তত্ত্ব—বিশেষত কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির কিছু মডেল—প্রস্তাব করে যে, অত্যন্ত দীর্ঘ সময় পরে কৃষ্ণগহ্বরের অভ্যন্তরে একটি কোয়ান্টাম বাউন্স ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে কৃষ্ণগহ্বরের শেষ পরিণতি হতে পারে একটি ক্ষুদ্র সাদা গহ্বরের মতো অবস্থা। এটি এখনো প্রমাণিত নয়, তবে সক্রিয় গবেষণার বিষয়।

যদি সাদা গহ্বর আবিষ্কৃত হয়

ভাবুন তো— যদি কোনো দিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সত্যিই একটি সাদা গহ্বর আবিষ্কার করেন, তাহলে কী হবে? তাহলে হয়তো— কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য নতুনভাবে বোঝা যাবে। বিগ ব্যাং সম্পর্কে নতুন ধারণা জন্ম নেবে। সময়ের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে যেতে পারে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতার মধ্যে সেতুবন্ধনের নতুন সূত্র মিলতে পারে।

শেষ কথা

মানুষের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এমন বহু ধারণা ছিল, যেগুলো প্রথমে ছিল কেবল গাণিতিক কল্পনা—পরে সেগুলো বাস্তব আবিষ্কারে পরিণত হয়েছে। সাদা গহ্বরও হয়তো তেমনই একটি সম্ভাবনা। হয়তো এটি কখনো প্রকৃতিতে পাওয়া যাবে না। আবার হয়তো আগামী শতাব্দীর কোনো মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র আমাদের সামনে এমন এক বিস্ময় উন্মোচন করবে, যা আজ কেবল সমীকরণের পাতায় বন্দী। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়—প্রশ্ন করতে, সন্দেহ করতে এবং অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে। হয়তো কোনো তরুণ পাঠক, যিনি আজ এই লেখাটি পড়ছেন, ভবিষ্যতে সেই বিজ্ঞানী হবেন যিনি প্রথম সাদা গহ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজে পাবেন। আর সেই দিনটি হলে, মানবসভ্যতার মহাবিশ্ব-অনুসন্ধানের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

 

Leave a comment

Bridging Science, Technology, and the Social Fabric

Newsletter Signup
Say Hello

Design by: Iftekhar Hossain  © Centre for Social Research-CSR 2026. All Rights Reserved.

From Physical Laws to Social Justice: Empowering the Analytical Mind.